প্রকাশিত:
১২ আগষ্ট ২০২৫, ১২:২০
অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরে ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি নিয়ে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন সমকালকে। সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো-
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর গত এক বছরে ব্যাংক খাতে পরিবর্তনের বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
মাহবুবুর রহমান: গত সরকারের আমলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে কয়েকটি ব্যাংককে ধারাবাহিকভাবে টাকা দেয়। ওই সময় এসব বিষয়ে জানলেও আমরা অনেক ক্ষেত্রে বলতে পারিনি। এখন শুনছি, কয়েকটি ব্যবসায়ী গ্রুপ প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা ঋণের নামে ব্যাংক থেকে বের করে নিয়ে গেছে।
এসব ঋণ ফেরত আসছে না। ফলে খেলাপি ঋণ ইতোমধ্যে পাঁচ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। একসময় নিয়মিতভাবে ব্যাংক ঋণে নয়ছয় হয়েছে এবং ঋণ নিয়ে পাচার হয়েছে। পট পরিবর্তনের আগে বৈদেশিক মুদ্রার বিশাল চাহিদা তৈরি হওয়ার মূল কারণ ছিল অর্থ পাচার।
২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত টাকার মূল্যমান একই থাকায় একটা মিথ্যা অহংকার তৈরি হয়। অথচ আমাদের চলতি হিসাব এবং বৈদেশিক লেনদেনে ভারসাম্যের অবস্থা খারাপ হয়ে যায়, যার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল অর্থ পাচার। রাষ্ট্র হিসেবে আমরা হয়তো খেলাপি হয়নি, তবে খেলাপি হওয়ার কাছাকাছি চলে গিয়েছিলাম। আর কিছুদিন চললে শ্রীলঙ্কার মতো বাংলাদেশ খেলাপি হতো।
সে বিবেচনায় এখনকার অবস্থার উন্নতি হয়েছে। এখন আন্তর্জাতিক নিয়ম পরিপালন করছি। আমাদের বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যে উদ্বৃত্ত হয়েছে। ডলারের দর বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার পরও স্থিতিশীল আছে। অর্থ উপদেষ্টা বলেছেন, ব্যাংক খাত খাদের কিনারায় চলে গিয়েছিল।
আসলেই কিন্তু তাই। যে পরিমাণ টাকা পাচার হচ্ছিল, তা অন্তত বন্ধ হয়েছে। ইতিবাচক দিক হলো, প্রতি মাসে আড়াই বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স আসছে। ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফেরাতে আর কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে বলে মনে করেন?
মাহবুবুর রহমান: সরকার পরিবর্তনের পর অনেক খাতেই সংস্কার হচ্ছে। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দৃশ্যমান সংস্কার হচ্ছে ব্যাংক খাতে। ব্যাংক খাতের প্রতি আস্থা বাড়াতে যা সহায়ক হয়েছে। পট পরিবর্তনের পরপরই মধ্যপ্রাচ্যের ব্যাংকগুলো ক্রেডিট লাইন বন্ধ করে দিয়েছিল।
এখন আবার তারা ফিরতে শুরু করেছে। ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। ব্যাংক রেজল্যুশন আইন এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের উদ্যোগ কার্যকর করতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয়, এখন অর্থ পাচার নিয়ন্ত্রণে এসেছে। সুদহার এবং ডলারের দর বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। এ অবস্থা ধরে রাখতে হবে।
ব্যাংকগুলোকে এখন খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র দেখাতে হচ্ছে। ফলে খেলাপি দ্রুত বাড়ছে। ব্যাংক খাতে এর প্রভাব কী?
মাহবুবুর রহমান : বিগত সরকারের সময়ে বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফের সঙ্গে যখনই বৈঠক হতো তারা বলত, তোমাদের অন্তত ২৫ শতাংশ ঋণখেলাপি। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর দায়িত্ব নিয়েই বলেছেন, আমাদের খেলাপি ঋণ ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ। আসলেই পরিস্থিতি এ রকম। কোনো কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ। এত খেলাপি ঋণ হলে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। অবশ্য খেলাপি ঋণ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনেক কাজ করছে।
ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ প্রণয়ন, ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনসহ সংস্কারে অনেক কাজ হচ্ছে। বিশেষ করে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন উদ্যোগ আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরেও সংস্কার আনা হচ্ছে। বর্তমান বাস্তবতায় খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত কঠিন। কেননা, বেশির ভাগ ঋণের বিপরীতে কোনো জামানত নেই। সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি করেও এসব ঋণ ঠিক করা সম্ভব নয়।
কিছু ব্যাংক একীভূতকরণের দরকার হবে। এর মাধ্যমে আমানতকারী শেয়ারহোল্ডার কিংবা বাইরে থেকে শেয়ারহোল্ডার আসতে পারে। এভাবে বিনিয়োগ এনে ব্যাংকগুলোকে হয়তো ঠিক করা হবে।
বড় ঋণের বেশির ভাগই নিয়ম মেনে না দেওয়ায় এখন খেলাপি হচ্ছে। ব্যাংকগুলো জেনেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব ঋণ দিয়েছে। এ অবস্থার স্থায়ী সমাধানে কী করা উচিত?
মাহবুবুর রহমান : বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে যেসব কাজ করছে, সেগুলো ঠিকভাবে করতে হবে। বিশেষ করে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা, দ্রুত সংশোধনমূলক ব্যবস্থা (পিসিএ) এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক রিপোর্টিং মান-৯ বাস্তবায়ন হলে কিছু ব্যাংক একীভূত হয়ে যাবে।
আরেকটি বিষয় হলো, বিচার ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে। দেওয়ানি আদালতে স্থগিতাদেশ নেওয়ার জন্য কিছু টাকা জমা দিতে হয়। একইভাবে নেগোশিয়েবল ইনস্টুমেন্ট অ্যাক্টের আওতায় কিছু টাকা জমা দিতে হয়। অর্থঋণ আদালতেও এ রকম ব্যবস্থা করতে হবে।
খেলাপি ঋণের ওপর সহজে স্থগিতাদেশ নেওয়াকে নিরুৎসাহিত করতে হবে। এ ছাড়া এখন নিষ্পত্তিতে ৮ থেকে ১০ বছর লাগে, যা দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে নামিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে আদালত এবং বিচারকের সংখ্যা বাড়াতে হবে।
বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ঋণখেলাপিদের ওপর সামাজিক চাপ তৈরির জন্য পাসপোর্ট জব্দ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন না করা, বিদেশ যেতে না দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নিতে হবে।
বর্তমান সরকার পাচার করা অর্থ ফেরত আনার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা কতটুকু সফল হবে বলে মনে করেন?
মাহবুবুর রহমান: পাচার করা অর্থ ফেরত আনা দীর্ঘ প্রক্রিয়া। দ্রুত ফলাফল পাওয়া যাবে না। সমস্যা হলো, টাকা যে এখান থেকে গেছে, তা প্রমাণ করা সময়সাপেক্ষ। আবার যেখানে গেছে, সে দেশের সরকার বা ব্যাংক সহায়তা করবে কিনা, তা একটা বিষয়।
পাচারকারীরা কয়েক স্তরের মাধ্যমে অর্থ বিদেশে নেয়। হয়তো সেখানে বৈধ হিসেবে প্রদর্শিত হচ্ছে। অবশ্য যুক্তরাজ্যে কিছু অর্থ ইতোমধ্যে ফ্রিজ হয়েছে। বৈশ্বিকভাবে পাচার করা অর্থ ফেরত আনার সফলতা খুব কম।
যেমন– ২০১৬ সালে দেশের রিজার্ভের অর্থ চুরি করে নেওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত। এর পরও প্রথমে কিছু অর্থ পাওয়া গেলেও তারপর আর পাওয়া যায়নি। আমি মনে করি, সবাই সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করলে হয়তো পাচার অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রে সফলতা আসবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানা উদ্যোগের পরও কিছু ব্যাংক আমানতকারীর টাকা ফেরত দিতে পারছে না? সামগ্রিক ব্যাংক খাতে এর প্রভাব কী?
মাহবুবুর রহমান: কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব ব্যাংককে কিছু অর্থ ধার হিসেবে দিয়েছে। তবে কোনো ব্যাংকের যদি ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ঋণ খারাপ হয়ে যায়, তাহলে টাকা ফেরত দেবে কীভাবে। সুদসহ ঋণ ফেরত আসবে, সেখান থেকে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেবে– এটাই নিয়ম। বেশির ভাগ ঋণখেলাপি হলে তা সম্ভব হয় না।
এমন অবস্থায় সরকার হয়তো ব্যাংক একীভূতকরণ করে আমানতকারীদের শেয়ারহোল্ডার করবে এবং একটি অংশের আমানত হয়তো ফেরত দেবে। এখন অবশ্য কিছু ব্যাংক উচ্চ সুদে আমানত নিয়ে সংকট কাটানোর চেষ্টা করছে। কিছু ব্যাংক অবশ্য সফল হয়েছে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক তারল্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়লে অনেক ব্যাংকের আমানত বাড়বে।
উচ্চ সুদের কারণে বিনিয়োগ বাড়ানো এখন দেশের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার কারণে বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে মনে করেন?
মাহবুবুর রহমান: বিনিয়োগের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা একটি বড় বিষয়, যা নিয়ে এখন ব্যবসায়ীরা প্রায়ই কথা বলছেন। একটি ভালো খবর হলো, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের বিষয়টি সরকার দক্ষতার সঙ্গে ব্যবস্থাপনা করেছে। এর মধ্যে ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আমাদের সম্ভাবনা বাড়িয়েছে। আমরা যত দ্রুত সুবিধা নিতে পারব, ততই ভালো হবে। এর পরও এখনই বিনিয়োগ হয়তো ব্যাপক বাড়বে না। ব্যবসায়ীরা হয়তো নির্বাচনের জন্য দেরি করবেন। জ্বালানি নিরাপত্তা না পাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী বিনিয়োগ করতে চাচ্ছেন না। ডলার সংকট না থাকলেও আমদানি বাড়ছে না।
বিশেষ করে মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমেছে। আবার বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৪০ শতাংশে নেমেছে, কোনোভাবেই যা ভালো লক্ষণ নয়। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কমে যাওয়ার মানে, কর্মসংস্থান কমে যাবে। ব্যাংকগুলোকে উচ্চ সুদে আমানত নিতে হচ্ছে। এর প্রভাব ঋণের সুদহারে পড়বে, যা স্বাভাবিক। তবে একটি ভালো বিষয় হলো, এখন আগ থেকেই পরিষ্কার দিকনির্দেশনা পাওয়া যাচ্ছে। যেমন– বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আগ থেকেই জানিয়ে দিয়েছেন মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না নামলে নীতি সুদহার কমবে না।
মন্তব্য করুন: