প্রকাশিত:
১৪ আগষ্ট ২০২৫, ১২:২৭
দূর থেকে মনে হবে কাচের প্রাসাদ, কাছে এলেই বোঝা যায়—না, এটা কাচ নয়, ইটও নয়—এটা রঙ-বেরঙের প্লাস্টিকের বোতলে গড়া এক আশ্চর্য দোতলা বাড়ি। ডুপ্লেক্স এই ভবনটি দেখতে ঠিক প্রাসাদের মতো।
আবর্জনার দেয়ালে মানে পরিত্যাক্ত বোতল দিয়ে তৈরী এই রঙিন স্বপ্নের প্রাসাদটি স্থানীয়দের মুখে মুখে এর নাম-‘বোতল বাড়ি’। অজোপাড়া গ্রামের এই ডুপ্লেক্স বাড়িটি এখন পুরো জেলায় আলোচনার তুফান তুলেছে।
বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার রামানন্দেরপাড় গ্রামে ঢুকতেই দূর থেকে চোখে পড়ে এই রঙিন অট্টালিকার। কাছে গেলে বোঝা যায়, এটি কোনো কাচের প্রাসাদ নয়—এ যেন রঙিন প্লাস্টিকের রাজ্য। পাঁচ কক্ষের দোতলা এই-‘বোতল বাড়ি’ এখন গোটা বরিশালের আলোচনার কেন্দ্র। এখন সেই বোতল বাড়ি দেখতে আসছে দূরদূরান্তের মানুষ।
যারা প্রথমে বলেছিল-‘আবর্জনা দিয়ে বাড়ি টেকে না’-তারা আজ গর্বের সঙ্গে ছবি তুলে নিয়ে যাচ্ছে। এমনকি তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। গল্পের শুরুটা ছিল কৌতূহল আর সংশয়ের। অনেকের কাছেই বিষয়টি ছিল অবিশ্বাস আর ঠাট্টার।
দন্ত চিকিৎসক পলাশ চন্দ্র বাড়ৈ যখন গ্রামবাসীকে বললেন, তিনি পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে ডুপ্লেক্স বাড়ি তুলবেন, তখন অনেকেই হেসে উড়িয়ে দিলেন। কিন্তু এক সকালে ট্রাকভর্তি নোংরা বোতল তার বাড়ির আঙিনায় নামতে শুরু করল। শ্রমিকরা বোতলে বালু ভরছে, সারি সারি সাজাচ্ছে—তখনও কেউ বুঝতে পারেনি, এখানে তৈরি হতে চলেছে এক পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের বিস্ময়।
দিন যেতে কাঠামো দাঁড়াতে শুরু করল, দেয়ালে ফুটে উঠল রঙের খেলা। যারা একসময় বলেছিল, ‘আবর্জনা দিয়ে বাড়ি হবে না’, তারাই এখন দাঁড়িয়ে বিস্ময়ে বলছেন—‘এ তো রাজপ্রাসাদ!’ ।
পলাশের দাবি, এই প্রযুক্তি এসেছে জাপান থেকে। দেয়াল গরমে ঠান্ডা, শীতে গরম। ইটের চেয়ে ৮০ গুণ বেশি শক্ত, আর নির্মাণ খরচ প্রায় ৩০ শতাংশ কম। সবচেয়ে বড় সাফল্য—অযত্নে ফেলে দেওয়া হাজার হাজার বোতল এখন বাঁচিয়েছে পরিবেশ, আর দিয়েছে মানুষের টেকসই আশ্রয়।
বাড়ি তৈরীর ভাবনা চিকিৎসকের মাথা থেকে বের হলেও কাজটি করেছেন গ্রামের রাজমিস্ত্রি কমল চন্দ্র। তিনি জীবনে এই প্রথম বোতল দিয়ে বাড়ি তৈরী করেছেন। তাও আবার একতল নয়, ডুপ্লেক্স ভবন। ভবনের দেয়ালে ইটের ব্যবহার করা হয়নি। শুধু বালুর দিয়ে প্লাস্টিকের বোতল ভর্তি করেছেন। সেই বালু ভর্তি বোতল একটার গা ঘেঁষে আরেকটি রেখে আবার তা বালু আর সিমেন্ট দিয়ে ঢেকে দিয়েছেন। এভাবেই প্রতিটি দেয়াল তৈরী হয়েছে।
শুধু কী দেয়াল? পুকুরের ঘাটলা, ভবনের প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে গভীর নলকূপের আশপাশটাও এই বোতলের তৈরী। গ্রামের রাজমিস্ত্রিরা বলছেন, জীবনে এমন নির্মাণ কাজ তারা দেখেননি। এমন নির্মাণ পদ্ধতি তাদের জীবনের বড় শিক্ষা। যে ভবন তৈরীতে কোন ইট ব্যবহার করা হয়নি। আমাদের হিসেবেই সাধারন বাড়ির থেকে কম করে হলেও ২০ শতাংশ নির্মান সামগ্রী কম লেগেছে। তাতে করে ভবন তৈরীতে খরচ কমে হয়েছে।পলাশের বাবা যতিশ চন্দ্র বাড়ৈ-মা কমলা বাড়ৈ গর্বে ভরে আছেন, আর গ্রামবাসীর কাছে এই বাড়ি এখন ‘পরিবেশের তাজমহল’।
রাজিহার সকারী প্রাথমি বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক যতিশ চন্দ্র বাড়ৈ বলেন, বোতল বাড়ি যেন প্রমাণ করে দিয়েছে—দূষণ সৃষ্টিকারী আবর্জনাও, সৃজনশীলতার ছোঁয়ায় হয়ে উঠতে পারে স্বপ্নের প্রাসাদ। শুরুতেই যারা বাড়ি নির্মান নিয়ে ব্যঙ্গ করেছিলেন, এখন তাদের পরিবারের অতিথি এলে তাদের নিয়ে এই ডুপ্লেক্স বাড়ি দেখতে আসেন।
মন্তব্য করুন: