প্রকাশিত:
১৬ আগষ্ট ২০২৫, ১৫:১৬
‘চাকরি হবে, সংসারটা একটু ভালোভাবে চলবে এই আশায় ৩০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। এখন বুঝতে পারছি, সেটাই ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।’ এভাবেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজের হতাশা প্রকাশ করছিলেন জয়পুরহাট জেলার কালাই উপজেলার আঁওড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলাম। শুধু তিনিই নন, তার মতো আরো ১৯৭ জন বেকার তরুণ-তরুণী একটি ভুয়া প্রতিষ্ঠান ‘সমাধান ফাউন্ডেশন’-এর প্রতারণার ফাঁদে পড়ে জীবনের কষ্টার্জিত সঞ্চয় হারিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে সাইফুল ইসলাম তার এক আত্মীয়ের মাধ্যমে বগুড়া শহরে ‘সমাধান ফাউন্ডেশন’-এর অফিসে যান। সেখানে আশরাফুল্যা, রাফিউর রহমান ও নাফিউর রহমান নামে কয়েকজন নিজেদের প্রতিষ্ঠানের নিয়োগদাতা পরিচয়ে পরিচয় দেন। তারা জানান, ‘সমাধান ফাউন্ডেশন’ একটি উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান, যা দেশে বিভিন্ন জেলায় বড় বড় প্রকল্প, যেমন- ফুড প্রডাক্ট, সুপারশপ, রিসোর্ট, ইটভাটা এবং পানির ফ্যাক্টরি ইত্যাদি বাস্তবায়ন করছে।
তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, মাসিক ৪০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি পাওয়া যাবে। শর্ত শুধু একটি, চাকরির নিশ্চয়তার জন্য ৩০ হাজার টাকা ‘জামানত’ জমা দিতে হবে। অনেকে নিজের জমানো টাকা আবার কেউ ধার-দেনা করে তাদের টাকা দেন।
সাইফুল ইসলামকে জানানো হয়, তিনি কালাই উপজেলার ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পাবেন, যার অধীনে থাকবেন ২৫ জন ফিল্ড অফিসার। তাকেও সদস্য সংগ্রহে নিয়োজিত করা হয়।
কিন্তু ধীরে ধীরে সাইফুল বুঝতে পারেন, এই ‘প্রকল্প’ আসলে শুধুই কথার ফুলঝুরি। কোথাও কোনো উন্নয়ন কার্যক্রম নেই, নেই কোনো প্রকৃত প্রতিষ্ঠানও।
ভুক্তভোগীদের দাবি, ‘সমাধান ফাউন্ডেশন’ নামের প্রতারণাচক্রের মূল কেন্দ্র ছিল ঢাকার উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টর এলাকায়। সেখান থেকে খন্দকার মেহেদী হাসান নামের এক ব্যক্তি এই চক্র পরিচালনা করতেন। বিভিন্ন এলাকায় কখনো এনজিও, কখনো সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা বা চেইন কম্পানির ছদ্মবেশে তারা প্রতারণা চালিয়ে গেছে।
বিভিন্ন সূত্রে কথা বলে জানা যায়, জয়পুরহাট থেকে মোট ১৯৭ জনের কাছ থেকে তারা প্রায় ৬০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। শুধু এখানেই নয়, চুয়াডাঙ্গা জেলায় মোহাম্মদী শপিং কমপ্লেক্সে একটি অফিস খুলে প্রতারণা শুরু করেন।
সেখান থেকে ২৪৪ জনের কাছ থেকে নিয়েছেন প্রায় ৭৪ লাখ টাকা এবং ঝিনাইদহ জেলায় নিঝুম টাওয়ারে আরেকটি অফিস খুলে ৪৬৯ জনের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে এক কোটি ৪০ লাখ টাকা। জাতীয় দৈনিকে খবর প্রকাশিত হলে ঝিনাইদহে পুলিশের অভিযানে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান খন্দকার মেহেদী হাসানকে আটক করা হয়। অফিস থেকে উদ্ধার হয় জাল রশিদ, ভুয়া নিয়োগপত্র ও সাজানো প্রকল্পের ফাইল। কিন্তু অভিযোগ না থাকায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর আবার নতুন পরিকল্পনায় বগুড়া ও জয়পুরহাটে শুরু হয় প্রতারণা।
কালাই উপজেলার আরেক ভুক্তভোগী সোহেল রানা বলেন, আমরা ২০ জন একসাথে আবেদন করেছিলাম। সবাই ৩০ হাজার টাকা করে দিয়েছি জেলা অর্গানাইজার নাফিউর রহমানের হাতে। বলেছিল এক মাস পর ফোন আসবে। দশ মাস পার হলেও সেই ফোন আর আসেনি।
বগুড়ার মালতিনগরের বাসিন্দা নাফিউর রহমান জানান, তিনিসহ বগুড়ার প্রায় তিন শতাধিক বেকার যুবক প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তিনি বাধ্য হয়ে সমাধান ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান খন্দকার মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে বগুড়া সদর থানা আমলি আদালতে মামলা করেছেন। তার ঠিকানা দেওয়া হয়েছে- রোড নম্বর-৩, বাসা নম্বর-৫, সেক্টর-১০, উত্তরা, ঢাকা।
বগুড়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াজেদ আলী বলেন, বগুড়া সদরে নিবন্ধিত কোনো এনজিওর তালিকায় ‘সমাধান ফাউন্ডেশন’ নামের কোনো সংস্থার অস্তিত্ব নেই। কেউ এখন পর্যন্ত লিখিত অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সমাধান ফাউন্ডেশনের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে খন্দকার মেহেদী হাসানকে তার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য করুন: