প্রকাশিত:
২১ আগষ্ট ২০২৫, ১৩:৪৬
শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চলের একটি গণকবর থেকে উদ্ধার হয়েছে ১৪১টি মানব কঙ্কালসহ শিশুদের সামগ্রী। এলাকাটি এক সময় যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকা ছিল। গণকবর থেকে শিশুদের ফিডার, খেলনা আর একটি স্কুলব্যাগসহ বেশ কিছু জিনিস উদ্ধার হয়েছে। গণকবরটি পাওয়া গেছে জাফনা শহরের কাছে চেম্মানি এলাকায়।
জায়গাটি ছিল একটি শ্মশান। জাফনা দেশটির তামিল সংখ্যালঘুদের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখানে মৃত ব্যক্তিদের খুব কম কবর দেওয়া হয়, কারণ হিন্দু ধর্মীয় প্রথা অনুযায়ী মৃতদেহ সাধারণত দাহ করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, গণকবর থেকে পাওয়া ১৪১টি মানব কঙ্কালের মধ্যে বিভিন্ন বয়সের কিছু শিশুদের কঙ্কালও রয়েছে।
গত জুনে এখানে খনন কাজ শুরু হয়। বৈদ্যুতিক শ্মশান তৈরির জন্য খনন করার সময় শ্রমিকরা মানুষের দেহাবশেষ খুঁজে পায়। টানা নয় দিন ধরে পরীক্ষামূলক খননে ১৯টি দেহাবশেষের সন্ধান মেলে। প্রায় ১.৫ মিটার গভীরতায় এলোমেলোভাবে দেওয়া কবর এবং পোশাকের অনুপস্থিতি কারণে এটিকে গণকবর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
ওই এলাকা জুনে অপরাধস্থল হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং জায়গাটি ঘিরে রাখা হয়। এখন পর্যন্ত ১৬৫ বর্গমিটার এলাকাজুড়ে মোট ১৪১টি কঙ্কাল উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে ১৩৫টির শরীরে কোনো পোশাক ছিল না, কেবল একটি প্রাপ্তবয়স্কের পোশাক শনাক্ত করা গেছে। একটি স্কুলব্যাগসহ উদ্ধার হওয়া কঙ্কালটি পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এটি ছিল ৪ থেকে ৬ বছর বয়সী একটি মেয়ের। এ ছাড়াও শিশুদের জামা, মোজা, জুতো, ছোট পুঁতির চুড়ি আর বেবি পাউডারের পাত্রও উদ্ধার করা হয়েছে।
এই মৃতদের পরিচয়, মৃত্যুর কারণ কিংবা সময় কিছুই স্পষ্ট নয়। তবে অনেকের ধারণা, এরা হতে পারেন সেই সাধারণ মানুষ, যারা শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধ চলাকালে নিখোঁজ হয়েছিলেন। ১৯৮৩ সালে শুরু হওয়া সেই যুদ্ধ সরকার ও তামিল বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল, যারা সংখ্যালঘুদের জন্য স্বাধীন মাতৃভূমি গড়তে লড়াই করছিলেন।
যুদ্ধ শেষ হয় ২০০৯ সালে। বছরের পর বছর এই অঞ্চলে বিভিন্ন তামিল সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং ভারতীয় শান্তিরক্ষী বাহিনী সক্রিয় ছিল। তবে নজর সবচেয়ে বেশি শ্রীলঙ্কান সেনাদের দিকেই, কারণ চেম্মানি এলাকায় তারা দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে শক্ত ঘাঁটি স্থাপন করে রেখেছিল। এটি জাফনায় প্রবেশের মূল প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত। উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে গৃহযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে সরকারি বাহিনী এবং বিদ্রোহী উভয়ের বিরুদ্ধেই যুদ্ধাপরাধসহ নানা নৃশংসতার অভিযোগ উঠেছিল।
২৭ বছর আগে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এক সৈনিকের স্বীকারোক্তি চেম্মানির এই গণকবরস্থল নিয়ে সন্দেহ আরো বাড়িয়ে তুলেছে। ১৯৯৮ সালে সোমারত্নে রাজাপক্ষে, ওই সেনা ও পুলিশের আরো চার সহযোগীকে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। এক স্কুলছাত্রীকে গণধর্ষণ, তাকে হত্যা করার পাশাপাশি তার মা, ভাই এবং এক প্রতিবেশীকে হত্যার অভিযোগে তাদের মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি দেওয়া হয়। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশ থাকায় এখনো তারা কারাগারে আছেন।
অভিযুক্তরা দাবি করেছেন, তারা এই অপরাধে জড়িত ছিলেন না, বরং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশে মৃতদেহ সরিয়ে ফেলেছিলেন। রাজাপক্ষে আদালতে বলেছিলেন, তিনি জানেন চেম্মানিতে প্রায় ৪০০টি মৃতদেহ কোথায় কবর দেওয়া হয়েছে।
১৯৯৯ সালে রাজাপক্ষে পুলিশকে এমন একটি স্থানে নিয়ে যান, যেখানে স্কুলছাত্রী, তার পরিবার ও প্রতিবেশীর কবর দেওয়া হয়েছিল। পরে তিনি আরো কয়েকটি স্থানের কথা জানান, যেখানে দেহাবশেষ পাওয়া যায়। কিন্তু হঠাৎ করেই তদন্ত থেমে যায়।
মানবাধিকার কর্মী ব্রিটো ফার্নান্দো বলেছেন, ‘আমরা এখনও নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না অপরাধীরা কারা, তবে আঙুল উঠছে (রাষ্ট্রীয়) সেনাবাহিনীর দিকেই।’
১৯৯৬ সালে বিদ্রোহীদের কাছ থেকে জাফনা পুনর্দখল করার পর থেকে ২০০৯ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত সেনাবাহিনী এই এলাকা, এমনকি শ্মশানও কঠোর নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। তারা চেকপোস্ট চালু করেছিল এবং যে কেউ এলাকায় প্রবেশ বা প্রস্থান করলে তাকে তল্লাশি করা হতো।
এদিকে ভুক্তভোগীদের পরিবার হত্যার বিচার চাইছে। অমলানাথন মেরি ক্যালিস্তার স্বামী ১৯৯৬ সালে সেনাদের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে নিখোঁজ। তিনি আশা করেছিলেন স্বামীর মৃত্যুর প্রমাণ পেলে অন্তত মানসিক শান্তি পাবেন। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি ওই গণকবর দেখতে গিয়েছিলাম অন্তত তার পোশাক দেখার আশায়।’
তিনি বলেন, ‘আমি কেবল ছোট ছোট বাচ্চাদের পোশাক দেখেছি।’
ক্যালিস্তা জানান, সেনাবাহিনী তল্লাশি চালানোর পর তাদের গ্রাম থেকে অন্তত ২৪ জন নিখোঁজ হন, যার মধ্যে তার স্বামীও রয়েছেন। পরিবারগুলো সেনাবাহিনীর গাড়ি আটকানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সেনারা বন্দুক তাক করে সবাইকে সরে যেতে বাধ্য করে এবং গাড়িগুলো দ্রুত সরে যায়।
তিনি বলেন, ‘আমার ইচ্ছা তিনি (স্বামী) যেন জীবিত ফিরে আসে। কিন্তু যদি তা সম্ভব না হয়, আমাদের আর কিছু করার নেই। রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের স্বীকার করতে হবে যে, তাকে আটক করা হয়েছে এবং তাদের হেফাজতেই আমার স্বামী মারা গেছেন। তাদের অবশ্যই আমাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।’ এমন আরো অনেক পরিবার তাদের প্রিয় মানুষকে খুঁজতে ওই গণকবর দেখতে ছুটে আসেন।
এদিকে শ্রীলঙ্কার মানবাধিকার কমিশনের ২০০৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯০ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের ২৮১টি অভিযোগ তারা তদন্ত করেছিল। এর মধ্যে তিনজনকে কারাগারে পাওয়া যায় এবং পরে মুক্তি দেওয়া হয়। বাকি সবাই এখনো নিখোঁজ। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২৪৩টি ঘটনার জন্য সেনাবাহিনী দায়ী, ২৫টির জন্য তামিল টাইগার বিদ্রোহীরা দায়ী এবং ১০টি ঘটনার জন্য কারা দায়ী তা অজানা। তবে কোনো শিশুর নাম নিখোঁজ তালিকায় ছিল না।
মানবাধিকার কর্মী ব্রিটো ফার্নান্দো বলেন, একটি বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত পরিচালনা করতে সরকারের আরো উদ্যোগী হতে হবে। তিনি বলেন, ‘গণকবর তদন্তের জন্য আমাদের কাছে সঠিক নির্দেশিকা নেই এবং ভুক্তভোগীদের সনাক্তকরণের সহায়তার জন্য কোনো ডিএনএ ব্যাংকও নেই।’
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, একটি জাতীয় ডিএনএ ব্যাংক তহবিল গঠন করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা নিতে হবে। খননকাজ পর্যবেক্ষণকারী আইনজীবী রানীথা জ্ঞানরাজা জানান, স্ক্যানকৃত এলাকা এখন পর্যন্ত খনন করা স্থানের তিনগুণ বড়। তাই তদন্তকারীরা আরো আট সপ্তাহ খননকাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি আদালতের কাছে চেয়েছেন।
শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার ওয়ারুনা গামাগে বলেন, ‘গণকবরের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে সেনাবাহিনীকে কেউ অভিযুক্ত করেনি। যদি কেউ করে, তবে তাদের প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘খননকাজ এখনো চলছে। এটি পুলিশ ও আদালতের অধীনে পরিচালিত একটি দেওয়ানি বিষয়। সেনাবাহিনী দেশের আইনকে সম্মান করে।’
মন্তব্য করুন: