প্রকাশিত:
৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১৮:১৭
নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি মঙ্গলবার পদত্যাগ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদ তীব্র হয়ে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেওয়ার পর তিনি পদত্যাগ করেন। দেশটি চলমান বিক্ষোভে অরাজকতায় নিমজ্জিত হলেও এখন জল্পনা চলছে, পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হবেন কে?
এই আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উঠে আসছে কাঠমাণ্ডুর মেয়র বালেন্দ্র শাহের নাম, যিনি বালেন শাহ নামেই বেশি পরিচিত। ৩৩ বছর বয়সী শাহ বিক্ষোভকারীদের মাঝে একটি গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ হয়ে উঠেছেন।
তিনি লিখেছেন, ‘আমার সম্পূর্ণ সহমর্মিতা তরুণদের প্রতি।’ বয়সসীমার কারণে সরাসরি বিক্ষোভে যোগ দিতে পারছেন না জানিয়ে তিনি আরো লিখেছেন, ‘এই সমাবেশ নিঃসন্দেহে জেন জি প্রজন্মের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন, যাদের কাছে আমিও হয়তো বয়স্ক মনে হতে পারি। আমি তাদের আকাঙ্ক্ষা, লক্ষ্য আর চিন্তাভাবনা বুঝতে চাই।’
গত কয়েক বছরে তিনি উদীয়মান নেতা হিসেবে খ্যাতি পেয়েছেন। টাইম ম্যাগাজিনের ‘টপ ১০০ এমার্জিং লিডারস’-এ স্থান পাওয়ার পর থেকেই আলোচনায় আসেন। স্বচ্ছতা আর তৃণমূলনির্ভর রাজনীতির জন্য জনপ্রিয়তা পান। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার থেকে র্যাপার, আর র্যাপার থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচনে জয় লাভ করেন শাহ। শহরের রাস্তা পরিষ্কার, সরকারি শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং কর ফাঁকি দেওয়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো উদ্যোগ তাকে ব্যাপক প্রশংসা এনে দিয়েছে।
অলির পদত্যাগের পর ইতিমধ্যেই জনসমক্ষে এক বিবৃতি দিয়েছেন তিনি। সেখানে তিনি তরুণদের আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও দেশের ভবিষ্যতের দায়িত্ব নিতে আহ্বান জানান। আবেগপূর্ণ ও দৃঢ় বার্তায় তিনি বলেন, ‘আমরা স্পষ্ট বলেছি, এটি একেবারেই জেন জি আন্দোলন। প্রিয় জেন জি, তোমাদের হত্যাকারীর পদত্যাগ হয়ে গেছে। এখন ধৈর্য ধরো।
’তিনি আরো বলেন, ‘দেশের মানুষ ও সম্পদের ক্ষতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দেশের মানুষের ক্ষতি মানে আমাদের নিজেদের ক্ষতি। এখন আমাদের সংযমী হওয়া জরুরি।’
রাজনীতিতে শাহর উত্থান একেবারেই অপ্রচলিত ভাবে। ছাদের ওপর গান গেয়ে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন র্যাপার হিসেবে, যেখানে উঠে আসত দারিদ্র্য, অনুন্নয়ন আর রাজনৈতিক দুর্নীতির কথা। তার জনপ্রিয় গান ‘বলিদান’ ইউটিউবে সাত মিলিয়নেরও বেশি ভিউ পেয়েছে, যা নেপালের হতাশ তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে দাগ কেটেছে।
শুধু শিল্পী নন, শাহ পড়াশোনা করেছেন স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। ২০২২ সালের মেয়র নির্বাচনে সেই পেশাগত দক্ষতার সঙ্গে তার জনমানসের জনপ্রিয়তাকে মিলিয়ে নিজেকে উপস্থাপন করেন দক্ষ ও বাস্তববাদী প্রার্থী হিসেবে।
অভিনব প্রচারণায় তার চিহ্ন হয়ে ওঠে কালো ব্লেজার, জিন্স, বর্গাকৃতি সানগ্লাস ও কাঁধে জড়ানো নেপালি পতাকা। পতাকা ব্যবহারে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ উঠলেও জনপ্রিয়তা আরো বেড়ে যায়।
শাহ কেবল মেয়র হিসেবে আলোচনায় আসেননি, তার সাফল্যকে বলা হচ্ছে ‘বালেন ইফেক্ট’—যা নেপালের রাজনীতিতে প্রজন্মগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। শাহর সাফল্য অনেক তরুণকে বিশ্বাস করিয়েছে, নেপালের দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝেও পরিবর্তন আনা সম্ভব।
‘দেশ রক্ষা করে যারা, তারা বোকা। সব নেতা চোর, দেশ লুটে খাচ্ছে’—এমন তীব্র রাজনৈতিক সমালোচনাই ছিল একসময় র্যাপার বালেন শাহর গানের কথা। এখন সেই বালেন শাহই কাঠমাণ্ডু মহানগরের মেয়র, আর তার উত্থান অনুপ্রেরণা দিয়েছে তরুণদের—রাজনীতিতে প্রবেশ করে পরিবর্তন আনার জন্য।
জেন জি প্রজন্মের আন্দোলনে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি পদত্যাগ করার পর এবার তরুণ প্রজন্ম চাইছে, শাহ দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিক।
মন্তব্য করুন: