প্রকাশিত:
১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১৪:৪৫
রংপুর অঞ্চলে বিষাক্ত মদ ও রেকটিফায়েড স্পিরিট খেয়ে মৃত্যুর ঘটনা যেন ভয়াবহ এক ধারাবাহিক ট্র্যাজেডিতে রূপ নিয়েছে। গত ৫ বছরের ব্যবধানে একই অঞ্চলে, একই কায়দায় এবং একই অপরাধে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৭ জন। এসব ঘটনার পরও ধরাছোঁয়ার বাইরে মাদক কারবারিরা। ফলে প্রশাসনের ভূমিকা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
সূত্র জানায়, ২০২০ সালে রংপুরের পীরগঞ্জ, বদরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর উপজেলায় রেকটিফায়েড স্পিরিট পানে একের পর এক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বদরগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের নুরুল ইসলাম (৩০), রংপুর সদর উপজেলার চন্দরপাট ইউনিয়নের সোহরার হোসেন ও মোস্তফা কামাল। একই বছর পীরগঞ্জের সাদুল্যাপুর এলাকার দুলা মিয়া, হরিরাম সাহাপুরের লাল মিয়া, শানেরহাটের সাবেক আওয়ামী লীগ সভাপতি সেলিম সরকার এবং কথিত মাদক কারবারি নওশাদসহ মোট ১০ জনের মৃত্যু হয়।
২০২৬ সালে এসে আবারও সেই একই দৃশ্যপট।
বদরগঞ্জ উপজেলায় রেকটিফায়েড স্পিরিট পান করে গত তিন দিনে ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, আরো অনেকে অসুস্থ হলেও সামাজিক আতঙ্ক ও পুলিশের ভয়ে গোপনে চিকিৎসা নিচ্ছেন তারা।
গত ১১ জানুয়ারি মধ্যরাতে বদরগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর এলাকায় চিহ্নিত মাদক কারবারি জয়নুল আবেদিনের বাড়ি থেকে স্পিরিট কিনে পান করেন কয়েক ব্যক্তি। এর পরপরই তারা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।
ওই রাতেই মারা যান গোপালপুর ইউনিয়নের বসন্তপুর গ্রামের আলমগীর হোসেন (৪০), পূর্ব শিবপুর গ্রামের সোহেল মিয়া (৩০) এবং রংপুর সদর উপজেলার সাহাপুর গ্রামের জেন্নাত আলী (৪১)।
পরদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মানিক চন্দ্র রায় (৬০), আব্দুল মালেক এবং রাশেদুল ইসলাম (২৫)। সবশেষ বুধবার (১৪ জানুয়ারি) ভোরে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান অভিযুক্ত মাদক কারবারি হাজতি জয়নুল আবেদিন (৪৬)।
রেকটিফায়েড স্পিরিট বিক্রির অভিযোগে জয়নুল আবেদিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাকে আদালতের মাধ্যমে রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।
কারাগারে পাঠানোর পর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অভিজিত চৌধুরী জানান, জয়নুল আবেদিনের বিরুদ্ধে মাদক ও হত্যাসহ একাধিক মামলা ছিল।
এদিকে, রাশেদুল ইসলামের মৃত্যু ঘিরে তৈরি হয়েছে রহস্য। নগরীর একটি এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। শরীরে আঘাতের চিহ্ন না থাকলেও পরিবারের দাবি, তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন। পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দাবি, বদরগঞ্জ ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে রেকটিফায়েড স্পিরিট ও চোলাই মদ বিক্রি হচ্ছে। গোপালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শামসুল আলম বলেন, প্রশাসনকে একাধিকবার জানিয়েছি। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় আজ এত প্রাণ ঝরছে।
পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় বদরগঞ্জ ও হাজিরহাট থানায় দুটি মামলা হয়েছে এবং অভিযুক্তের কাছ থেকে ১০ বোতল রেকটিফায়েড স্পিরিট উদ্ধার করা হয়েছে। রংপুর সদর কোতোয়ালি থানার ওসি আব্দুর গফুর বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইলফোন ও অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করে তদন্ত চলছে।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন-২০২০ সালের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পরও কেন একই অপরাধ আবার ঘটল? কোথা থেকে আসছে এই রেকটিফায়েড স্পিরিট? শিল্পকারখানা ও হাসপাতালের জন্য নির্ধারিত এই রাসায়নিক কিভাবে মাদক কারবারিদের হাতে পৌঁছাচ্ছে, তার জবাব আজও অজানা।
সচেতন মহল মনে করছেন, শুধু গ্রেপ্তার নয়, স্পিরিটের উৎস শনাক্ত, সরবরাহ চেইনে কড়া নজরদারি, স্থানীয় পুলিশ-প্রশাসনের জবাবদিহি এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে এই মৃত্যু মিছিল থামবে না। প্রশ্ন একটাই-আর কত লাশ পড়লে টনক নড়বে প্রশাসনের? রংপুরের মানুষ এখন শোক নয়, জবাব চায়।
মন্তব্য করুন: