প্রকাশিত:
২৬ জানুয়ারী ২০২৬, ১৪:৫৮
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের ভবিষ্যৎ অবস্থা সম্পর্কে বহু গুরুত্বপূর্ণ হাদিসে আমাদের অবহিত করেছেন। এসব বর্ণনা শুধু কিয়ামতের আলামত হিসেবেই নয়, বরং প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য গভীর সতর্কবার্তা ও আত্মসমালোচনার আয়না। যখন মানুষের জ্ঞানচর্চা দুর্বল হয়ে পড়ে, সময়ের বরকত হারিয়ে যায়, সমাজে অশান্তি ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়তে থাকে—তখনই নবীজি ﷺ–এর বর্ণিত নিদর্শনগুলোর সঙ্গে বাস্তবতার বিস্ময়কর মিল লক্ষ্য করা যায়।
এমনই একটি তাৎপর্যপূর্ণ হাদিসে তিনি কিয়ামতের পূর্ববর্তী সময়ের একটি সামগ্রিক সমাজচিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন।
আবূ হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
“কিয়ামত কায়িম হবে না, যতক্ষণ না ইলম উঠিয়ে নেওয়া হবে, ভূমিকম্পের আধিক্য ঘটবে, সময় সংকুচিত হয়ে আসবে, ফিতনা প্রকাশ পাবে, হারজ বৃদ্ধি পাবে—আর হারজ হলো খুন-খারাবি—এবং তোমাদের মধ্যে ধন-সম্পদ এত বেড়ে যাবে যে তা উপচে পড়বে।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০৩৬)
এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ কিয়ামতের পূর্ববর্তী সময়ের কয়েকটি স্পষ্ট আলামতের কথা উল্লেখ করেছেন, যা আমাদের বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত।
এখানে ইলম উঠে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে, কিতাব-পুস্তক হঠাৎ করে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে। বরং প্রকৃত দ্বিনি ইলম বহনকারী আলেমদের ইন্তেকালের মাধ্যমে সমাজ থেকে সহিহ জ্ঞান ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
এর ফলস্বরূপ মানুষ অজ্ঞ নেতৃত্বের অনুসরণ করবে, না জেনে ফতোয়া দেবে এবং গোমরাহি ব্যাপক আকার ধারণ করবে।
ভূমিকম্প কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; বরং তা আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ধরনের সতর্কসংকেত। মানুষ যখন গুনাহ, জুলুম ও নাফরমানিতে সীমা অতিক্রম করে, তখন এসব ঘটনা তাদেরকে তাওবার দিকে আহ্বান করে এবং আল্লাহর শক্তি ও ক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
সময় সংকুচিত হওয়ার অর্থ হলো সময়ের বরকত উঠে যাওয়া। দিন, মাস ও বছর অতি দ্রুত পার হয়ে যাবে। মানুষ অনুভব করবে—অনেক ব্যস্ততা থাকা সত্ত্বেও যেন কিছুই করা হয়নি। কাজের চাপ বাড়বে, কিন্তু কাজের ফলপ্রসূতা কমে যাবে।
ফিতনা বলতে আকিদা, চরিত্র, রাজনীতি, সমাজ ও পারিবারিক জীবনে বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলাকে বোঝানো হয়েছে। হক ও বাতিলের পার্থক্য অস্পষ্ট হয়ে যাবে। সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো কঠিন হবে এবং মিথ্যা নানা রূপে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে।
হারজ অর্থ নির্বিচার হত্যা ও রক্তপাত। মানুষ কেন হত্যা করছে, অনেক সময় নিজেরাও তা স্পষ্টভাবে জানবে না। মানবজীবনের মূল্য তুচ্ছ হয়ে যাবে এবং সামান্য কারণেই বড় সহিংসতা সংঘটিত হবে।
ধন-সম্পদ বাড়বে, কিন্তু তাতে বরকত থাকবে না। ধনী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও প্রকৃত তৃপ্তি, নিরাপত্তা ও প্রশান্তি কমে যাবে। যাকাত ও সদকা গ্রহণের মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে, অথচ অন্তরে প্রশান্তি অনুপস্থিত থাকবে।
এই হাদিস আমাদের কেবল ভবিষ্যতের সংবাদই দেয় না; বরং আত্মশুদ্ধি, প্রকৃত ইলম অর্জন, ফিতনা থেকে আত্মরক্ষা এবং মানবিক মূল্যবোধ সংরক্ষণের জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা প্রদান করে।
নবীজি ﷺ–এর এই বাণী আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়—সময় থাকতে তাওবা করা, সত্যের পথে দৃঢ় থাকা এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করাই প্রকৃত মুক্তির পথ।
মন্তব্য করুন: